বাংলা রোমান্টিক গল্প।বাংলা ছোট গল্প।প্রেম বর্ষণের রাতে।।

 প্রায় ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে অফিস থেকে বাসায় আসে আরান।গেটের সামনে ব্রেক করে চাবিটা দারোয়ানের দিকে ছুড়ে মারে গাড়ি পার্ক করার জন্য।শার্টের হাতাগুলো ফোল্ড করতে করতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।সে মনে মনে যা ভেবেছিলো তাই।আর একটু দেরি তার জীবনের অনেক কিছু পাল্টে দিত।রাগে চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আরানের।গম্ভীর কন্ঠে বলে,"কি হচ্ছে এখানে?"


মেহেক চিরপরিচিত সেই কন্ঠস্বরটা শুনে চোখ তুলে তাকায়।আরানকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠে।কান্নার বেগ কয়েকগুন বেড়ে যায়।সবার দৃষ্টি এখন আরানের দিকে।আরান এবার গর্জে ওঠে।"আমি কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছি, কি হচ্ছে এখানে?"


আরানের মা কাচুমাচু করতে করতে বলে, "বাবা বাইরে এসো।আমি সব বলছি তোমাকে।আরানের হাত ধরে বাইরে নিয়ে যেতে উদ্যত হলেই সে জোরে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়।"আম্মু যা বলার সবার সামনেই বলো।"

আরানের মা চুপ হয়ে যায়।বাড়িতে আসা মহিলাদের একজন বলে উঠে,"দেখতে পাচ্ছো না তুমি কি হচ্ছে এখানে।তোমার চাচার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে দিতে এসেছি।"


আরান হাত মুস্টিবদ্ধ করে নিজের রাগটাকে সংযত রাখে।দুহাত পকেটে গুজে শান্ত কন্ঠে বলে,"বিয়ে!বিয়ে হবে তাইনা!কার সম্মতিতে।কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন হ্যা!"


"কার কাছ থেকে আবার তোমার পরিবারের সবার সম্মতিতেই তো বিয়ে হচ্ছিলো।"


"সেটা এখন আর হবে না।এখন এসব নাটক বন্ধ করুন আর আসতে পারেন আপনারা।"


যারা এসেছিলো সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।পাত্রের মা আরানের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"আপা আপনার ছেলে কি বলছে এসব!"


ওনার কোনো ভাবান্তর নেই।কিই বা বলবেন তিনি।

"কি বলেছি শুনতে পাননি!আর যা যা নিয়ে এসেছেন সব নিয়ে এখনি বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে।"


আরানের বাবা এতোক্ষণে মুখ খুললেন।"আরান কি হয়েছে এমন করছো কেন?"


"বাবা প্লিজ তুমি একটু চুপ থাকো।সব বলছি তোমাকে আমি।আপনারা এখনও দাড়িয়ে আছেন কেন!"


"আমাদের এখানে ডেকে এভাবে অপমান না করলেও পারতেন!"


"দেখুন অনেক ভদ্রভাবে বলছি,প্লিজ বেরিয়ে যান।"


"আমাদেরও এতো শখ ছিলো না এই এতিম মেয়েকে আমাদের ছেলের বউ করার।তোমার মা ই তো আমাদের অনেক আকুতি মিনতি করে আমাদের রাজি করিয়েছে।পাত্র এতোক্ষণ চুপ থাকলেও এবার বলতে শুরু করলো,আন্টি আমাদের এখানে এনে অপমান করার চাইতে আপনার নিজের ঘরে চোখ দিতেন!কি আছে আপনার আর এই মেয়ের মধ্য।মেহেকের দিকে কেমন কুনজরে তাকিয়ে আছে ছেলেটি।আরান তার কাছে গিয়ে শার্টের কলারটা চেপে ধরে।"তোর মুখ দিয়ে যদি আর একটাও বাজে কথা বের হয় তাহলে এখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবি না।এখােনই জীবন্ত পুতে ফেলবো।"

_______________________________


সবাই চুপচাপ।কেউ কোনো কথা বলছে না।মেহেক নিঃশব্দে এখনো কেঁদে চলেছে।আরানের চাচা সোফায় বসা ছিল।আরান তার সামনে গিয়ে দুহাটু ভাজ করে বসে বলে,"আচ্ছা চাচ্চু আমি কি দেখতে শুনতে খারাপ।নাকি আমার খারাপ কোনো অভ্যাস আছে?চাচ্চু বলো আমি তোমার হাত ধরে বড় হয়নি?"

আরানের চাচা মাথা দোলায়।


"তাহলে আম্মু যখন আমার আর মেহেকের বিয়ের কথা বলেছিলো তখন কেন না করেছিলে?"


"আরান তোর কোথাও ভুল হচ্ছে।তোর মা আমার সাথে এমন কোনো কথাই বলে নি।সে বলেছে মেহেক এই বিয়েতে রাজি।তাইতো আমি আর তোর বাবা সব ব্যাবস্থা করেছি।ছেলে নিউইয়র্ক চলে যাবে কয়দিন পর।সাথে বউকেও নিয়ে যাবে।আজ আকদটা সেরে আনুষ্ঠানিকতা পরে করবো ভেবেছিলাম।আর তোর তো ইমারজেন্সি মিটিং ছিলো তাই তোকে বলিনি।বিকেলে বাসায় আসলে তুই তো সব জানতেই পারতি আর দেখতিও।"


আরান যা বুঝার বুঝে গেছে।সে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে মায়ের দিকে তাকায়।তিনি মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছেন।আরান তার মায়ের মুখোমুখি এসে দাড়ায়।


"কেমন মা তুমি?যে নিজের সন্তানের সুখের কথা ভাবে না।তুমি তো জানতে সবটা।তাহলে কেন এমন করলে বলো আম্মু!"


"আমি চেয়েছিলাম এই মেয়ের ছায়াও যাতে আমার ছেলের উপর না পড়ে।জন্মের সময় মাকে মেরে ফেলেছে।আর হয়েই বাবার ব্যবসা ডুবিয়েছে।অনেকগুলো পাত্রপক্ষ তো দেখতে এসেছে ওকে।কিন্তু সবাই না করে দিয়েছে।এমন অপয়া মেয়েকে আমার ছেলের বউ হিসেবে কখনো চাইবো না আমি।তাই ওকে এখান থেকে বিদায় করতে চেয়েছিলাম।"


এসব শুনে মেহেক পুরো জমে গেছে।কান্নাও থেমে গেছে।কথায় আছে না,অল্প কষ্টে কাতর অতি কষ্টে পাথর।সে এতোদিন যাকে মায়ের জায়গা দিয়েছিলো সেই কিনা এসব বলছে।


"শুনো আম্মু জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে।বেবি জন্ম দেওয়ার সময় প্রতিনিয়ত এমন হাজারো মা মৃত্যু বরণ করে।তার দোষ তুমি মেহেককে দিতে পারো না।চাচুর ব্যবসায় লস হয়েছে চাচুর অনভিজ্ঞতার কারণে।আর রইল পাত্রপক্ষের কথা।তারা না করে দিতো কারণ আমিই তাদের না করাতাম।আর তুমি এসবের জন্য ওকে দায়ি করে বসে আছো।শুনে রাখো ভালোবাসি আমি মেহেককে।আমি থাকতে কেউ ওর চুলও বাকা করতে পারবে না।আরান বাবার দিকে ফিরে বলে,"বাবা বিয়ে করতে চাই আমি মেহেককে।মেহেকের হাত ধরে টানতে টানতে সেখান থেকে চলে যায় আরান।


আরানের রুমের এককোণায় দাড়িয়ে আছে মেহেক।কোনো কথা বলছে না।দৃষ্টি নিচের দিকে।আরান ওর কাছে এসে হাত দিয়ে গালদুটো ধরে আলতো করে মাথাটা উপরে তুলে।


"কি কথা বলবে না আমার সাথে।"


"কেন এসেছেন হ্যা!বিয়ে একেবারে হয়ে গেলে আসতেন।কতটা ভয় পেয়েছিলাম জানেন।কতবার কল করেছি আপনাকে।আর একটু হলে তো আমি মরেই যেতাম বলে আবারও কান্না জুড়ে দেয় মেহেক।


"আরান তাকে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।


"হুশশ!মরার কথা একদম বলবে না।আমি মিটিংয়ে ছিলাম।ফোন ছিলো আমার কেবিনে।কেবিনে এসে যখন দেখলাম তোমার অনেকগুলো মিসড কল তখনই ছুটে এসেছি।এখন আর ভয় নেই।কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না বলে মেহেককে গভীরভাবে বুকে জড়িয়ে নেয় আরান।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তাকে শান্ত করে।কপালে দীর্ঘ একটা চুমো একে দেয়।


আরানের বাবা এখনও গম্ভীর হয়ে আছেন।তার চাচাও কোনো কথা বলছেন না।মাথা নিচু করে বসে আছেন। কিই বা বলবেন তিনি।

কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ তুলে তাকান তিনি।

"যা হওয়ার হয়েছে।দেখেছিস তো আরান কতোটা ভালোবাসে মেহেককে।আমি চাই ওকে আমার ছেলের বউ বানাতে।তুই কি বলিস?"

আরানের চাচার মুখ খুশিতে জ্বলে উঠে।তিনি ভেবেছিলেন খারাপ কিছু হবে।কিন্তু না।আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।তিনি সম্মতি সূচক মাথা দোলান।


"তাহলে বিয়ের ব্যবস্থা কর এবং তা আজকেই।আরানের চাচা বেরিয়ে গেলেন।আরানপর বাবা আরানের মায়ের কাছে আসলেন।তিনি অপরাধীর ন্যায় দাড়িয়ে আছেন।

"কি ক্ষতি করেছিলো মেয়েটা তোমার।কেন আমাদের এমন মিথ্যে বললে?আজ অনেক বড় পাপ থেকে বেচেছি।"


হতাশার দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে তিনিও বাইরে চলে গেলেন।


----------------------------------------------------------------

"মেহেক মা পারলে আমাকে ক্ষমা দিস।তোকে নিয়ে আমার ভুল ধারনা ছিলো।আমি ভুল প্রমাণিত হয়েছি।আমি যা করেছি তা হয়তো ক্ষমার যোগ্য না।মেহেকের হাত দুটো ধরে আরানের মা কথাগুলো বলে মেহেকের দিকে অপরাধী মুখ করে দাড়িয়ে আছে।

"কি বলছো বড় আম্মু।তুমি না আমার আম্মু তুমি কেন ক্ষমা চাচ্ছো।আমাদের জন্য শুধু দোয়া করো বলে ওনাকে জড়িয়ে ধরলেন।দুজনের চোখেই পানি।রুমে প্রবেশ করার আগে দরজায় দাড়িয়ে এসব দেখে আরান মুচকি হাসলো।


ছাদের দোলনায় আরানের কোলে একপাশ হয়ে গলা জড়িয়ে বসে আছে মেহেক।একটু আগেই কাজি এসে বিয়ে পরিয়ে গেছে তাদের।নৌকার ন্যায় অর্ধচন্দ্র তাদের দিকে উকি দিচ্ছে।মনে হয় চাঁদেরও হিংসে হচ্ছে তাদের এই ভালোবাসায়।আকাশে অগণিত তারার মেলা।কিন্তু সেসবে আরানের অনিহা।সে তো তার সদ্য বিবাহিত প্রেমময়ীর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে।মেহেক একটার পর একটা বলেই যাচ্ছে।হঠাৎ করেই যেন চাদঁটা কোথায় হারিয়ে গেল।মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ।মেঘের মৃদু গর্জন শুরু হলো।শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি।কিছুক্ষণেই দুজন কাক ভেজা হয়ে গেল।মেহেক আরানের কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো উপরে তুলে দিয়ে গালে টুপ করে একটা চুমো দিয়ে দৌড়ে পালালো।ছাদের মাঝখানটায় গিয়ে দুহাত মেলে ভিজতে লাগলো।টকটকে লাল শাড়ি পরেছে সে।চুলগুলো খোলা।মুখে বৃষ্টির ফোটাগুলো মুক্তার ন্যায় জ্বলজ্বল করছে।আরান এখনো থ হয়ে সেখানেই বসে আছে মেহেকের দিকে তাকিয়ে।একটুপর উঠে দাড়িয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে মেহেকের দিকে।তার পরনের সাদা পাঞ্জাবিটাও গায়ের সাথে একদম লেপ্টে গেছে।মেহেকের একদম কাছে চলে আসে আরান।মেহেক চলে যেতে নিলেই হাত টান দিয়ে আরো কাছে নিয়ে আসে আরান।মেহেকের হাত এখন আরানের বুকের বা পাশটায়।আরানের হার্ট খুব দ্রুত বিট করছে যা মেহেক হাত দিয়ে অনুভব করতে পারছে।আরান হুট করেই মেহেককে কোলে তুলে নেয়।মেহেক আরানের গলা জড়িয়ে ধরে।


আকাশ যেমন বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করেছে তেমনি আজ এক জোড়া শালিকের হৃদয়ে হবে প্রেমের বর্ষণ।


(সমাপ্ত)




প্রেম_বর্ষণের_রাতে

Khaled_Imam

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ