প্রাইমারি স্কুলের ক্রাশ।বাংলা ছোট গল্প।Bangla short story
ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন প্রথম কোনো ছেলেকে ভালো লেগেছিল। তার নাম ছিল আহির।ছেলেটা আবার ছিল আমার এক বছরের জুনিয়র।আহির ক্লাস ফোরে পড়ত। স্কুলের এক অনুষ্ঠানে সে গান গেয়েছিল সেই দিন তার গান শুনেই সেই ছোট্ট বয়সে তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে যাই।তখন ক্রাশ শব্দের গভীরতা জানা তো দূরের কথা,ক্রাশ শব্দটাই ছিল আমার কাছে অপরিচিত একটা শব্দ । সেই ছোট্ট বয়সে শুধু এইটাই বুঝতাম ঐ আহির নামের ছেলেটাকে আমার ভীষন ভালো লাগে।তাই স্কুলের যত প্রতিযোগিতায় আহির অংশগ্রহণ করতো আমিও সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম।খেলাধুলায় আমার দক্ষতা ছিল ঘোড়ার ডিম তাও আমাকে সে সব খেলায় অংশগ্রহন করতে হবে যেসব খেলায় আহির অংশগ্রহন করবে।যেদিনই নতুন বেঞ্চে বসতাম আমার একটা কাজ ছিল দায়িত্ব নিয়ে বেঞ্চে আহিরের নাম লিখা। মাঝে মাঝে তো বেঞ্চে A + P ও লিখতাম আর মনে মনে হাসতাম,পরে আবার মনে মনে লজ্জা পেয়ে সেগুলো আবার কেটেও দিতাম।
ক্লাস ফাইভে আমার ক্লাস রোল ছিল এক।আহিরের রোল ও ছিল এক।যেহেতু দুজনের রোল সেইম ছিলো তাই প্রায় সব পরীক্ষায় দুজনের একই বেঞ্চে সিট পড়ত।পরীক্ষার সময় ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চটা বোধ হয় আমাদের জন্যই বরাদ্দ থাকত।পরীক্ষার হলে আমার সিটের পজিশন থাকত এমন জায়গায় যেখানে আমার একপাশে থাকত দেয়াল আর অন্য পাশে থাকত আহির।অর্থাৎ আমাকে যদি বেঞ্চ থেকে বের হতে হয় তবে অবশ্যই আহির কে বেঞ্চ হতে বের হয়ে আমাকে রাস্তা দিতে হবে।ক্রাশকে দূর হতে দেখাটা যত সহজ, তাকে সামনে পেলে বা তাকে পাশে পেলে তার সাথে কথা বলাটা ততটাই কঠিন। তাই আহির কে যে বলব তুমি সর আমি বেঞ্চ থেকে বের হবো সেই কথাটাও আমার মুখ থেকে বের হত না।তাই কষ্ট করে বেঞ্চের নিচে দিয়ে আসা যাওয়া করতাম।আর আমার এইসব কান্ডকারখানায় আহির শুধু অবাক হতো আর মুখ টিপে হাসত। তবে যাইহোক ছেলেটার হাসিটা খুবই সুন্দর ছিলো তার হাসি আমার মতো বিদঘুটে আর ভয়ংকর ছিল না।তবে এই বেঞ্চের নিচে দিয়ে আসা যাওয়া করতে গিয়ে কতবার যে মাথায় আঘাত পেয়েছি তা আর গুনা হয়নি।ক্রাশ বেঞ্চ পার্টনার হলে যা হয় আরকি।
আহিরের সাথে আমার কেবল দুবারই কথা হয়েছিল। প্রথম যেদিন কথা হয়েছিল আহির পরীক্ষা চলাকালীন আমার রাবারটা কিছুক্ষণ ব্যবহার করার অনুমতি চেয়েছিলো।আমি খুশি হয়েই ওকে আমার পছন্দের রাবারটা দিয়েছিলাম।শুধু ব্যবহার করতেই দেয়নি একেবারে তাকে চিরজীবনের জন্য গিফ্ট করে দিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার কথা হয়েছিল ইংরেজি পরীক্ষার সময়। পরীক্ষা চলাকালীন ও আমাকে একটা ইংরেজি শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করেছিল আমি ওকে সেই শব্দের অর্থটা বলেওছিলাম তারপর আহির খুব সুন্দর করে,যত্ন করে আমাকে বলেছিলো –" ধন্যবাদ আপু"। সেদিন বেয়াদব টাকে মনে মনে যা ইচ্ছা হয় তাই বলেছিলাম। মানছি আমি তার থেকে একটু বড় কিন্তু তবুও যদি ও আমার নাম ধরে ডাকত আমি কিছুই মনে করতাম না কি দরকার ছিল তার আমাকে আপু ডেকে আমার ছোটো ভাই হওয়ার। সেদিন রেগে মনে মনে ওকে একটা নামও দিয়ে ফেলেছিলাম "আহির দ্যা ছোডো ভাই"।
ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার পর আমি মাধ্যমিকে অন্য একটা স্কুলে ভর্তি হয়ে যাই। তাই আহিরের সাথে তখন আর দেখা হতো না।আমি শুধু জানতাম আমার এক সহপাঠীর বাড়ির কাছেই আহিরের বাড়ি।তাই একদিন সেই সহপাঠীর সাথে সেই সহপাঠীর বাড়িতে ঘুরতে যাই। কিন্তু সহপাঠী কি না কি ভাববে সেই ভয়ে কোন বাড়িটা আহিরের বাড়ি সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস করতে পারি নি।সেদিন সেই ছোট্ট বয়সেও প্রখর রোদে পুড়ে,ঘেমে,এতদূর হেটে যেতে যেতে বেশ মজা লাগছিলো।হাজার হলেও সেটা ক্রাশের এলাকা অপ্রত্যাশিতভাবে যদি রাস্তায় তার সাথে দেখা হয়ে যায়। সেদিনের সেই অনুভূতিটাই অন্যরকম ছিল।
কিন্তু সেদিন এতদূর রোদে পুড়ে হেটে তার এলাকা ঘুরে এসেও তার সাথে দেখা হয়নি। তার উপর ধানক্ষেতের মাঝের সরু রাস্তা দিয়ে হেটে আসার সময় ধানক্ষেতে পড়ে, কাদায় মাখামাখি হয়ে,জুতা ছিঁড়ে, কাঁদতে কাদঁতে বাড়ি ফিরেছিলাম। তার উপর ঐ রোদে পড়ে এতদূর ঘুরতে যাওয়ায়, আর ধানক্ষেতে সাঁতার কেটে আসার কান্ডকারখানার জন্য মার কাছ থেকে প্রচুর বকা শুনতে হয়েছিল। তারসাথে এতদূর হাটার পুরষ্কার হিসেবে পায়ে ব্যাথা তো আছেই। তারপর সেদিনের সেই কাদাঁময় অভিজ্ঞতার পর আহিরের এলাকায় ঘুরতে যাওয়ার আর আহিরকে খোঁজার কোনো ইচ্ছা আর হয়নি তাই সেই ক্রাশ দর্শনও আর আমার হয়নি।
শুনেছি পৃথিবীটা নাকি গোল।গোল এই পৃথিবীতে নাকি এক মানুষের সাথে বারবার দেখা হয়ে যায়। যতদূর মনে পড়ে আহির দেখতে একদম ধবধবে সাদা ছিল,তার চুলগুলো ছিল সিল্কি,সেই ছোট বয়সেও সবসময় হাতে একটা কালো ঘড়ি পড়ে থাকত।সেই বয়সের ছেলেকে তখন হ্যান্ডসাম বলা যায় কি না জানি না তবে তাকে নির্দ্বিধায় স্টাইলিশ বলা যেতো।আমার স্মৃতিশক্তি এতটা প্রখর যে আমি নিজের উপর বিশ্বাস রেখে বলতে পারি এখন যদি কখনো আমি আহিরকে সামনে দেখি তবে তাঁকে জীবনেও চিনতে পারব না।বর্তমানে এই বয়সে যেখানে একজনকে দু-তিনবার দেখে ও চেহারা মনে রাখতে পারি না সেখানে ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন দেখা সেই আহিরকে দেখেই চিনে ফেলাটা কেবল রুপকথার গল্প।দুঃখিত আহির আমি আমার কল্পনায় তোমার সেই ছোট্টবেলার স্কেচ ধরে রাখতে পারি নি।গোল এই পৃথিবীতে একদিন হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে কিন্তু সেদিন হয়তো দুজনেই দুজনকে না চিনে পাশ কাটিয়ে চলে যাব।আমার সাথে আহির নামক সেই ক্রাশের গল্পটা হয়তো এভাবে না চিনতে পেরে শেষ হবে কিংবা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাস্ততার ভিড়ে হয়তো কোনোদিন তার সাথে দেখা হয়েছিলো কিন্তু অপরিচিত ভেবে হয়তো তাকে না চিনেই পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি।
সমাপ্ত
প্রাইমারির_সেই_ক্রাশ

0 মন্তব্যসমূহ